আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম। বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ স্বল্প আয়ের। অনেক সময় তাদের ঘরের মেয়েরা মাতৃত্বকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি পায়না ফলে গর্ভের সন্তান অপুষ্টিতে ভুগে।
এই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার গর্ভবতী মায়েদের জন্য একটি বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছে যাকে বলা হয় মাতৃত্বকালীন ভাতা। এই মাতৃত্বকালীন ভাতার আওতাধীন গর্ভবতী মায়েরা প্রায় ৩ বছর পর্যন্ত সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকেন।
মাতৃত্বকালীন ভাতা বা গর্ভবতী ভাতা পেয়ে মায়েদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে যার ফলে বাংলাদেশে যেই সমস্যা রয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষদের মাঝে পুষ্টিহীনতা সেই সমস্যা কমে যাচ্ছে।
আবার অনেক গর্ভবতী মা আছে যাদের স্বামী নেই বা স্বামী ঠিকমতো দেখাশোনা করেনা তাদের জন্য এই ভাতার গুরুত্ব অনেক বেশি। এই ভাতা পেয়ে তারা তাদের দৈনিক চাহিদার কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারে।
তাই আসুন জেনে নিই ২০২৬ সালে মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরণ করার নিয়ম এবং গর্ভকালীন ভাতা পেতে কী কী কাগজপত্র দরকার হয় সকল তথ্য।
মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম ২০২৬
সরকারের মাতৃত্বকালীন ভাতা এমন একটি সেবা যার ফলে গর্ভবতী মায়েরা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকেন। নিচে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হলোঃ
মাতৃত্বকালীন ভাতা বা মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি কী?
বাংলাদেশ সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই ভাতা প্রদান করা হয়। গ্রাম বা শহরের দরিদ্র, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়ের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত ও গর্ভের শিশুর উত্তম শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকার এই ভাতা বা অনুদান প্রদান করে থাকে।
পূর্বে সরকারের এই অনুদান সেবাটি শহরে ও গ্রামে দুইটি নামে পরিচালনা করা হতো শহরে এটি ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল এবং গ্রামে দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা নামে পরিচালিত হতো।
কিন্তু বর্তমান সময়ে এই সেবা দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে দুইটি নামকে একত্রিত করে একসাথে
MCBP বা মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি নামে গোটা দেশে পরিচালিত হয়ে থাকে।
মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদনে কি কি কাগজ লাগে
গর্ভকালীন ভাতা বা মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করতে বেশ কিছু কাগজপত্র দরকার হয়ে থাকে নিচে সেগুলো দেয়া হলো।
- গর্ভবতী মায়ের ভোটার আইডি কার্ড এর ফটোকপি।
- স্বামীর ভোটার আইডি কার্ড এর ফটোকপি।
- দুই কপি ছবি।
- কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি মেডিকেলের গর্ভধারণের সার্টিফিকেট বা ANC কার্ড।
- সর্বশেষ করা আল্ট্রাসাউন্ডের কপি।
- হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ রশিদের কপি। (জায়গা ভেদে প্রয়োজন হতে পারে আবার প্রয়োজন না হতেও পারে)
- টাকা গ্রহণ করতে আবেদনকারী মায়ের নিজের নামে থাকা মোবাইল নাম্বার যেখানে মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট খোলা আছে।
মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা বা শর্ত
বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ মানুষ গর্ভকালীন এই ভাতা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা বা শর্তগুলো নিচে দেয়া হলো।
- বয়সঃ মাতৃত্বকালীন এই ভাতা সুবিধা পেতে একজন মায়ের বয়স অবশ্যই ২০ বছরের ঊর্ধ্বে হতে হবে এবং ৩৫ বছরের বেশি হওয়া যাবেনা।
- সন্তানের সংখ্যাঃ ভাতা তারাই পাবেন যারা প্রথম ও দ্বিতীয় গর্ভধারণ করেছেন। এর ঊর্ধ্বে তৃতীয় বা তার বেশি সন্তানের জন্য এই ভাতার আওতাধীন হবেন না।
- গর্ভকালঃ মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদনের সময় হলো গর্ভাবস্থার ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
- আর্থিক অবস্থাঃ গরীব ভূমিহীন বা থাকার বাড়ি ছাড়া ভূমি নেই এমন অসচ্ছল পরিবারের মায়েরা এবং মোট মাসিক আয় ১৫০০ টাকার নিচে এমন হলে আবেদন করতে পারবেন।
- বিশেষ তথ্যঃ গর্ভবতী মা যদি প্রতিবন্ধী হয়ে থাকে তাহলে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবেন।
মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন ওয়েবসাইট থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন ফর্ম নামিয়ে পূরণ করে পৌরসভা, ইউনিয়ন বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের অনুমতি পত্রসহ উপজেলা নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
এক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফর্মে থাকা সকল তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি মেডিকেলের ডাক্তারের কাছে থেকে গর্ভধারণের সনদপত্র আবেদন ফর্মের সাথে যুক্ত করতে হবে।
মাতৃত্বকালীন ভাতা অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম ২০২৬
আপনি অনলাইনে মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করতে পারবেন অনেক সহজেই তবে মনে রাখতে হবে আপনার দেয়া সব তথ্য হতে হবে আসল। আপনি আবেদন করার পরে যাচাই বাছাই করে আপনাকে গর্ভবতী ভাতা পাওয়ার যোগ্য মনে হলে তার পরে আপনি পাবেন।
অনলাইনে আবেদন করতে কয়েকটি ধাপ আপনাকে অনুসরণ করতে হবে সেগুলো নিচে দেয়া হলো।
ধাপ-১ঃ প্রথমেই আপনাকে
মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগইন করে “New Application’ এ ক্লিক করে প্রথমেই নির্ভুল ভাবে ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করতে হবে। আপনার নাম, পিতা-মাতার নামসহ সকল তথ্য সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে। অবশ্যই প্রথমে আপনাকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর সিলেক্ট করতে হবে।
ধাপ-২ঃ এবার আপনাকে স্থায়ী ঠিকানা সম্পূর্ণ নির্ভুল ভাবে পূরণ করতে হবে মনে রাখবেন আপনার দেয়া ঠিকানা আর NID কার্ডের ঠিকানা যেনো পুরোটা মিল থাকে। আপনার যদি বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানা আলাদা হয়ে থাকে তাহলে আপনি সেভাবেই আলাদাভাবে তথ্য দিবেন।
ধাপ-৩ঃ এবার আপনাকে আপনার পরিবারের আর্থ সামাজিক অবস্থার তথ্য প্রদান করতে হবে যেমন পরিবারের কে উপার্জন করে, প্রতিবন্ধী কেউ আছে কিনা, কৃষিজমি কতোটুকু আছে ও পরিবারের মাসিক আয় কতো টাকা।
ধাপ-৪ঃ এই ধাপে আপনি কিভাবে আপনার মাতৃত্বকালীন ভাতা গ্রহন করবেন তা সিলেক্ট করতে হবে আপনার কাছে দুইটি অপশন থাকবে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের।
আপনার জন্য সবথেকে ভালো হবে যদি মোবাইল ব্যাংকিং যেমন রকেট, বিকাশ, নগদ, উপায় সিলেক্ট করে সেই নাম্বারটি দিন এতে করে টাকা পাওয়ার পরে বের করতে সুবিধা হবে।
ধাপ-৫ঃ মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদনের শেষ ধাপে আপনাকে আপনার ছবি সংযুক্ত করতে হবে এবং নিজের একটি সিগনেচার করে আবেদন ফর্ম জমা দিতে হবে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আবেদন করার প্রতি ধাপের ছবি বা স্ক্রিনশট এখানে দেয়া সম্ভব হয়নি গুগল কপিরাইট পলিসির কারনে তবে আমাদের বলে দেয়া নিয়ম অনুসরণ করলে সফলভাবে আবেদন করতে পারবেন।)
মাতৃত্বকালীন ভাতা কত টাকা
উপরের দেখানো মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার পরে যদি আপনি এই ভাতা প্রাপ্তির জন্য চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হয়ে যান তাহলে প্রতি ৬ মাস পর পর সরকার থেকে আপনার দেয়া একাউন্টে ৪৮০০ টাকা দেয়া হবে।
গর্ভকালীন এই ভাতা আপনি ৪ বার অর্থাৎ দুই বছর থেকে ৬ বার অর্থাৎ ৩ বছর পর্যন্ত পেতে পারেন এক্ষেত্রে আপনার কততম সন্তান হচ্ছে সেটির উপর নির্ভর করবে।
Disclaimer: মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম জানতে পারলেন তবে আমরা সরকারি কোনো কর্মকর্তা নয়। ভাতা আবেদনের নিয়ম, যোগ্যতা ও টাকার পরিমাণ সরকারি সিদ্ধান্তে পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে বাংলাদেশ সরকারের বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে সম্পুর্ণ নিয়ম দেখে নিতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১ঃ একজন মা কতবার এই ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন?
উত্তরঃ একজন মা দুইবার এই ভাতা নেয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় বাচ্চার ক্ষেত্রে তবে বাচ্চা মারা গেলে সঠিক নিয়মে তৃতীয় বাচ্চার ক্ষেত্রেও আবেদন করা যায়।
প্রশ্ন ২ঃ সরকারি চাকরিজীবী বা অন্য ভাতার আওতাভুক্ত মায়েরা কি এই ভাতা পাবেন?
উত্তরঃ সরকারি চাকরিজীবী বা অন্য কোনো ভাতার অন্তর্ভুক্ত মায়েরা মাতৃত্বকালীন ভাতা পাবেন না।
প্রশ্ন ৩ঃ মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য আবেদন কখন করতে হয়?
উত্তরঃ এই ভাতা পেতে হলে আপনাকে ৪ থেকে ৬ মাসের গর্ভবতী হতে হবে তবেই আবেদন করতে পারবেন।
শেষকথা
আশা করি আজকের পোস্ট পড়ে আপনি সঠিকভাবে ২০২৬ মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম জানতে পেরেছেন। এটি শুধুমাত্র সরকারি ভাতা নয় বরং মা ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা।
লেখক পরিচিতি,
নাম: মোঃ আব্দুর রাকিব।
আমি একজন প্রফেশনাল কনটেন্ট রাইটার। আমি সবসময় অফিসিয়াল তথ্য ভেরিফাই করে কনটেন্ট তৈরি করি।
আরো কিছু সরকারি সেবা দেখুনঃ