আজকের পোস্টে আমরা ছাদ বাগানে কোন কোন সবজি চাষ করা যায় তা জানবো। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
শহরে আবাদি জমি খুঁজে পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব একটি কাজ বর্তমানে। তাই এখন মানুষ নিজের বাড়ির ছাদ কে বাগান করার কাজে ব্যবহার করছে। আমরা যদি সঠিকভাবে ছাদ বাগান করতে পারি তাহলে জমির মতো বাসার ছাদেও সবজি চাষ করে সফলতা অর্জন করতে পারবো।
এই পোস্ট শেষ পর্যন্ত পড়লে আমরা জানতে পারবো ছাদ বাগানে কোন কোন সবজি চাষ করা যায়, ছাদ বাগানে চাষযোগ্য সেরা সবজিগুলো ও ছাদ বাগানের সাধারণ সমস্যা ও সমাধান।
এছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারবেন যেমন, ছাদ বাগান করতে টবের সাইজ কতো রাখতে হবে এবং ছাদ বাগানের জন্য মাটি তৈরির গোপন ফর্মুলা।
ছাদ বাগানে কোন কোন সবজি চাষ করা যায়?
ছাদ বাগানে শীতের সবজি
ফুলকপি ও বাঁধাকপি
- উপযুক্ত পাত্রঃ আপনি যদি টবে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করতে চান তাহলে ১০ ইঞ্চি টবে ১ টি করে চারা দিবেন আর যদি ক্যারেট ব্যবহার করেন তবে একটা বড় সাইজের ক্যারেটে ৩ থেকে ৪ টি চারা গাছ লাগাবেন।
- সূর্যালোকঃ ছাদ বাগানে ফুলকপি চাষ করে সফল হতে হলে অবশ্যই ছাদের এমন অংশ বেছে নিবেন যেখানে সারাদিন রোদ পড়ে। ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে কড়া রোদ প্রয়োজন হয়।
- বোনাস টিপসঃ গাছ চারা অবস্থায় সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে গাছে খৈল পচা পানির মতো জৈব সার প্রয়োগ করলে গাছ অনেক ভালোভাবে বেড়ে উঠে।
ওলকপি ও সালগম
- উপযুক্ত পাত্রঃ ওলকপি ও সালগম চাষ করতে হলে আপনাকে ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি টবে অথবা গ্রো ব্যাগে চারা রোপণ করতে হবে।
- সূর্যালোকঃ ওলকপি ও সালগমের চাষ করে সফলতা অর্জন করতে হলে অবশ্যই দিনে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা সূর্যের আলো যেনো পেতে পারে এমন জায়গা বেছে নিবেন।
লালশাক ও পালং শাক
- উপযুক্ত পাত্রঃ ফলের দোকান থেকে প্লাস্টিকের ক্যারেট কিনে এনে নিচে পলিথিন বিছিয়ে পলিথিন ফুটো ফুটো করে নিতে হবে।
- সূর্যালোকঃ ছাদের এমন অংশে শাক চাষ করতে হবে যেনো দিনে ৪-৫ ঘন্টা রোদ পায়।
বারোমাসি সবজি
কাঁচামরিচ
- উপযুক্ত পাত্রঃ ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি মাটি অথবা প্লাস্টিকের টবে চারা রোপণ করতে হবে।
- সূর্যালোকঃ ছাদের এমন অংশে বাগানটি করবেন যাতে গাছ দিনে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা সরাসরি সূর্যের আলো পায়।
- বোনাস টিপসঃ কখনোই মরিচ গাছের গোড়ায় অতিরিক্ত পানি জমতে দিবেন না কারণ পানি জমে থাকলে গাছের ফুল পড়ে যায়।
টমেটো ও চেরি টমেটো
- উপযুক্ত পাত্রঃ টমেটো চাষ করার জন্য ১২ ইঞ্চি টব বা ফলের প্লাস্টিক ক্যারেট দরকার হয়।
- সূর্যালোকঃ সারাদিনে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা কড়া রোদ পায় এমন স্থান নির্বাচন করুন।
- বোনাস টিপসঃ টমেটো যখন গাছে ধরবে তখন একটু ঝড় হলেও গাছের ডাল টমেটোর ভরে ভেঙে যেতে পারে তাই লাঠি দিয়ে ভর দিয়ে রাখুন ভালোভাবে।
পুূদিনা ও ধনেপাতা
- উপযুক্ত পাত্রঃ ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি গভীরতা সম্পূর্ণ টব বা যেকোনো পাত্র যেমন বালতি জিও ব্যাগ হলেই পুদিনা ও ধনেপাতা চাষ করতে পারবেন।
- সূর্যালোকঃ ছাদের যেই অংশে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা হালকা রোদ থাকে সেই অংশটি পুদিনা ও ধনে চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। বেশি রোদ পড়লেও সমস্যা হবেনা আপনি যেকোনো জায়গায় চাষ করতে পারেন।
বারোমাসি বেগুন
- উপযুক্ত পাত্রঃ মাঝারি সাইজের ড্রাম বা প্লাস্টিকের বালতি অথবা জিও ব্যাগে অনায়াসে বেগুন চাষ করতে পারবেন।
- রোদঃ দিনে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা রোদ পেলেই বেগুন গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারবে।
- বোনাস টিপসঃ বেগুনের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো ডগা ও ফল ছিদ্র কারি পোকা এগুলো থেকে গাছকে বাঁচাতে হবে। এর জন্য আপনি নিয়মিত বেগুনের গাছে নিম পাতার রস ছেটাবেন এতে ফসল ভালো থাকবে।
ছাদ বাগানে মাচাই চাষকরা যায় এমন লতানো সবজি
লাউ ও মিষ্টিকুমড়া
আপনার ছাদে মাচা করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ও পরিবেশ থাকলে লাউ ও মিষ্টিকুমড়া চাষ করা আপনার জন্য লাভজনক হতে পারে আমি নিজে আমার ছাদ বাগানে লাউ করেছিলাম বর্তমানে লাউ একবার হারভেস্ট একই মাচাই মিষ্টি কুমড়া ও পুঁইশাক করেছি।
- পাত্রঃ সিমেন্টের বড় টব অথবা ড্রাম কেটে হাফ ড্রাম করতে হবে।
- রোদঃ লাউ ও মিষ্টিকুমড়া চাষ করতে দিনে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা রোদ দরকার হয়ে থাকে।
- বোনাস টিপসঃ লাউ ও মিষ্টিকুমড়া গাছের পরাগায়ন ছাড়া ফলন পাওয়া সম্ভব না আর যেহেতু ছাদে স্বাভাবিক পরিমাণ মৌমাছি আসেনা ও পরাগায়ন ঘটায় না তাই নিজ হাতে সকাল করে পরাগায়ন করতে হবে।
পুঁইশাক ও বরবটি
- পাত্রঃ পুঁইশাক ও বরবটি চাষ করতে মাঝারি সাইজের ড্রাম বা বড় সিমেন্টের টব দরকার হবে।
করলা
- পাত্রঃ ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি টব অথবা হাফ ড্রামে করলা রোপণ করতে হবে।
- রোদঃ গাছে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা রোদ পড়লে ভালো ফলন পাবেন।
ছাদ বাগানের সাধারণ সমস্যা ও সমাধান
সমস্যা ১: গাছে প্রচুর ফুল আসে কিন্তু সবজি না হয়েই ঝরে যায়
- কারণঃ বহুতল ভবনের ছাদে অনেকসময় মৌমাছি, প্রজাতি বা ফুলের পরাগায়নে সহায়তাকারী কীট পৌঁছাতে পারেনা ফলে পরাগায়ন হতে না পেরে গাছে প্রচুর ফুল আসলেও সবজি না হয়েই ঝরে যায়।
- সমাধানঃ আপনার ছাদ বাগানের গাছে যতোই ফুল আসুক পরাগায়ন না হতে পারলে ফল ধরবেনা তাই নিজ হাতে পরাগায়ন ঘটাতে হবে। সকালে পুরুষ ফুল ছিড়ে মেয়ে ফুলের উপরে ঘষা দিতে হবে। এছাড়াও ছাদে মৌমাছি আনতে গাদা ফুলের গাছ লাগিয়ে রাখতে পারেন এতে মৌমাছিরা আকর্ষিত হয়।
সমস্যা ২: টমেটো, মরিচ বা বেগুন গাছের পাতা কোঁকড়ালো হয়ে যাওয়া
- কারণঃ এই সমস্যাটি হয় একধরনের ভাইরাস থেকে এছাড়াও মাকড় ও সাদা মাছির আক্রমণের কারনেও ছাদ বাগানের গাছের পাতা কোঁকড়ালো হয়ে যায়।
- সমাধানঃ আপনি যদি পাতা কোঁকড়ালো সমস্যায় পড়েন তাহলে প্রথমেই আপনি আক্রান্ত অংশগুলো ছেটে ফেলে দিন। এবার নিম পাতার রসের সাথে বাসন মাজা লিকুইড যোগ করে মিশ্রণ তৈরি করে গাছে নিয়মিত দিন। সমস্যা অনেক বেশি হলে বাজার থেকে অ্যাক্টোরা বা টিডো কিনে এনে প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ মিলি করে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করুন।
সমস্যা ৩: গাছের গোড়া পচা বা শিকড় পচে গাছ হঠাৎ মরে যাওয়া
- কারণঃ টবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দিলে এবং টবের যদি ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকে তাহলে গাছের গোড়ায় পানি জমে গোড়া পচে যায়।
- সমাধানঃ টবে অবশ্যই ১ থেকে ২ ইঞ্চি গর্ত করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং গোড়া পচা রোধে নিমের খৈল বা বাজার থেকে ছত্রাক নাশক নিয়ে এসে দিয়ে রাখবেন। মনে রাখবেন গাছের গোড়া সামান্য ভেজা থাকলেও পানি দিবেন না।
সমস্যা ৪: সবজি গাছের ফল ফেটে যাওয়া বা তলা কালো হয়ে পচে যাওয়া
- কারণঃ গাছের গোড়ায় ক্যালসিয়াম কমে যাওয়া এবং সঠিক সময়ে পানি সেচ না দেয়ার কারণে ফল ফেটে যাওয়া ও তলা কালো হয়ে পচে যাওয়া সমস্যা হয়ে থাকে।
- সমাধানঃ গাছে সঠিক সময়ে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাতে গাছের গোড়ায় ডিমের খোসার গুড়ো বা গুড়ো চুন মেশাতে হবে।
ছাদ বাগানের জন্য আদর্শ উর্বর মাটি তৈরির সিক্রেট ফর্মুলা
মাটির আদর্শ উপাদান ও সঠিক অনুপাত
দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি
জৈব সার বা কম্পোস্ট
কোকোপিট বা কাঠের মিহি গুঁড়ো
অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান যুক্ত করার নিয়ম
- ১ কাপ হাড়ের গুড়োঃ ১ বস্তা মাটির মিশ্রণের সাথে ১ কাপ হাড়ের গুড়ো ভালোভাবে মেশালে গাছের ফসফরাসের অভাব মেটাতে সহায়তা করে এবং গাছের শিকড় শক্ত ও অধিক পরিমাণে ফল-ফুল গাছে আসে।
- ১ কাপ শিং কুচিঃ গাছে নাইট্রোজেনের যোগান দিতে শিং কুচির বিকল্প নাই তাই ১ বস্তা পরিমাণ মাটির মিশ্রণের সাথে ১ কাপ শিং কুচি মেশাতে হবে।
- ২ চামচ নিম খৈলঃ মাটিতপ নিম খৈল মেশালে গাছকে ফাঙ্গাস ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এছাড়া মাটিতে পোকামাকড়, ক্ষতিকর কৃমি ও পিপড়া থাকলে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
- ১ চামচ ট্রাইকোডার্মা পাউডারঃ এই পাউডার মাটির মিশ্রণের সাথে মেশালে গাছের গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধ করে কারণ এটি খুবই উপকারী ছত্রাক নাশক।