আজকের পোস্টে আমরা ২০২৬ সালে বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি, টবে কিভাবে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করবেন, মাটিতে কিভাবে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করবেন এই বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করবো।
বাংলাদেশে এতদিন আমরা দেখেছি যেই আঙ্গুর চাষ হতো সেগুলো টক হতো। সবাই জানতো বাংলাদেশে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করা সম্ভব না তবে গত কয়েক বছর ধরে এই ধারণা ভুল প্রমাণ হয়েছে বর্তমানে বাংলাদেশে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ হচ্ছে।
যার কারণে অনেকেই এখন বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি জানতে চাচ্ছে তাই বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি টবে ও মাটিতে মিষ্টি আঙ্গুর চাষের সম্পূর্ণ গাইড আজকের পোস্টে প্রদান করবো।
বাংলাদেশে চাষের উপযোগী সেরা কয়েকটি মিষ্টি আঙ্গুরের জাত
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল যে এই দেশের আবহাওয়া ও মাটি আঙ্গুর চাষের জন্যে উপযোগী নয় আর চাষ হলেও টক জাতের আঙ্গুর হবে। তবে এই ধারণা পুরোটা পাল্টে দিয়েছে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান এবং আমাদের দেশের সাধারণ কৃষকদের কষ্টের কারণে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করা হচ্ছে বাণিজ্যিক এবং পার্সোনাল দুইভাবেই। অনেকে শখের বসে ছাদ বাগানে টবে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করছে আবার অনেকে বাণিজ্যিক ভাবে মাটিতে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করছে।
এই মিষ্টি আঙ্গুরের বেশ কিছু জাত বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে যেগুলো নিচে দেয়া হলো।
বাউ আঙ্গুর-১
- ফলন ও স্বাদঃ এই জাতের আঙ্গুর সাধারণত মাঝারি সাইজের হয়ে থাকে এবং এর স্বাদ মিষ্টি।
- বৈশিষ্ট্যঃ বাংলাদেশের আবহাওয়া আর্দ্র ও গরমে খুবই স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠতে পারে। বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করার জন্য এটি একটি সেরা জাত কারন এই জাতের আঙ্গুর গাছের রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি।
বাউ আঙ্গুর-২
- ফলন ও স্বাদঃ এই জাতের আঙ্গুর গাছে খুব ঘন ঘন ধরে থাকে এবং এর রং অনেক আকর্ষণীয় ও স্বাদে অনেক মিষ্টি হয়ে থাকে।
ছক্কা জাতের আঙ্গুর
ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙ্গুর
- ফলন ও স্বাদঃ এটি আঙ্গুর অত্যন্ত মিষ্টি একটি জাত এবং বাংলাদেশে এর ফলন খুবই ভালো। সবচেয়ে ভালো গুণ হলো এর ভেতরে বিচি একেবারেই কম থাকে।
- বৈশিষ্ট্যঃ ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙ্গুর একটি বিদেশি জাত তার পরেও এই জাতের আঙ্গুর বাংলাদেশের আবহাওয়াতে ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছে।
নিচের টেবিল থেকে মিষ্টি আঙ্গুরের জাত ও তাদের বৈশিষ্ট্য দেখুন
| জাতের নাম | ফলের রঙ | স্বাদের ধরন | কার জন্য উপযোগী |
|---|---|---|---|
| বাউ আঙ্গুর-১ | হালকা সবুজ ও হলুদের মতো ভাব | মিষ্টি ও রসালো হয়ে থাকে | ছাদ বাগান এবং বাণিজ্যিক চাষের জন্য উপযোগী |
| বাউ আঙ্গুর-২ | গাঢ় সবুজ | কড়া মিষ্টি | মাঠ পর্যায়ে চাষের জন্য উপযোগী |
| ব্ল্যাক ম্যাজিক | কালো ও গাঢ় বেগুনি | বেশি মিষ্টি এবং বীজ খুবই কম | ছাদ বাগান এবং টবে চাষের জন্য খুবই ভালো |
| ছক্কা | সবুজ ও লালচে | মিষ্টি ও ক্রিস্পি | শৌখিন চাষ ও ছাদ বাগানের জন্য উপযোগী |
জাত চেনার উপায় ও ভালো চারা সংগ্রহের টিপস
- কলমের চারা কিনুনঃ আপনি সবসময় কলমের চারা কিনবেন কারন বীজের চারার থেকে কলমের চারায় শতভাগ মিষ্টি আঙ্গুর ধরবে।
- বিশ্বস্ত সোর্সঃ সবসময় রেপুটেশন ভালো এমন নার্সারিতে গিয়ে আঙ্গুরের চারা ক্রয় করবেন।
আঙ্গুর চাষের জন্য আবহাওয়া ও মাটি নির্বাচন
কোন মাটিতে আঙ্গুর ভালো হয়?
- দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটিঃ জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ এই মাটিতে সবথেকে ভালো আঙ্গুরের চাষ হয় কারন এই দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে আঙ্গুর গাছের শেকড় খুব ভালোভাবে ছড়াতে পারে।
- মাটির পিএইচ মানঃ আঙ্গুর চাষ করতে আপনার নির্বাচিত মাটির পিএইচ (Ph) মান অবশ্যই ৬ থেকে ৭.৫ হতে হবে। বেশি অম্লীয় বা ক্ষারীয় মাটিতে আঙ্গুর ফল চাষ ভালো হয়না।
- কঙ্করযুক্ত বা লাল মাটি: বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের লাল মাটি অথবা কঙ্করযুক্ত মাটিতেও চাইলে প্রয়োজনীয় জৈব সার দিয়ে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি মেনে খুব ভালো চাষ করা যায়।
সূর্যালোক বা রোদের গুরুত্ব (কেন রোদ অপরিহার্য)
আঙ্গুর চাষ করে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রায় পুরোপুরি রোদের উপর নির্ভর করতে হবে। এমন জায়গা যদি নির্বাচন করেন যেখানে রোদ পাওয়া যায়না তাহলে আঙ্গুর গাছ ভালো হবে না এবং ফল টক হবে।
- দৈনিক রোদের পরিমাণঃ আঙ্গুর গাছ সঠিক ভাবে বেড়ে উঠতে ও ফল মিষ্টি হতে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘন্টা গাছে রোদ পড়তে হবে।
- ছাদ বাগানের অবস্থানঃ যারা বাসার ছাদে আঙ্গুর ফলের বাগান করতে চান তারা অবশ্যই ছাদের এমন জায়গা নির্বাচন করবেন যেনো সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সেখানে রোদ থাকে।
- ফাঙ্গাস বা রোগ প্রতিরোধঃ শুধু ফল ভালোভাবে পাকাতে রোদের প্রয়োজন হয়না সাথে গাছের অন্যতম প্রধান বাধা ফাঙ্গাস গাছকে ক্ষতি করতে পারেনা এবং গাছের রোদ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব
- গ্রীষ্মকালঃ মার্চ থেকে জুন এই সময়ের তীব্র রোদ ও গরমের ফলে আঙ্গুর প্রচুর মিষ্টি ও রসালো হয়ে থাকে।
- শীতকালঃ এই শীতের সময় আঙ্গুর গাছ ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে এবং গাছের সব পাতা ফেলে দেয়। গাছের এই বিশ্রামের ফলে পরবর্তীতে আরো প্রচুর পরিমাণে ফল গাছে ধরে থাকে।
আঙ্গুর বীজ থেকে চারা উৎপাদন পদ্ধতি
আপনি যদি বাণিজ্যিক ভাবে বা বাসায় যেভাবেই হোক আঙ্গুর চাষ করতে চান তাহলে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো ও কার্যকরী অপশন হলো নার্সারি থেকে কলম বা গ্রাভটিংয়ের চারা কিনে নিয়ে আশা।
তার পরেও যদি সখের বসে আঙ্গুর বীজ থেকে চারা উৎপাদন পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করতে চান তাহলে নিচের ধাপ গুলো অনুসরণ করুনঃ
ধাপ-১ঃ সঠিক বীজ সংগ্রহ এবং ভালো বীজ চেনার উপায়।
- বাজার থেকে মিষ্টি জাতের সম্পুর্ন পাকা আঙ্গুর কিনে নিয়ে আসুন।
- এবার আঙ্গুর কেটে ভেতর থেকে বীজ খুব সাবধানে বের করুন।
- এবার বীজ গুলোতে লেগে থাকা আঠালো রস ধুয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
- ভালো বীজ চেনার উপায়ঃ কোনটি ভালো বীজ আর কোনটি খারাপ সেটি বুঝতে এক গ্লাস পানি নিয়ে আঙ্গুরের বীজ পানিতে ছেড়ে দিন। যদি বীজ নিচে পড়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে এই বীজ দিয়ে গাছ হওয়া সম্ভব। আর বীজ ভেসে থাকলে সেটি ফেলে দিন এই বীজে গাছ হবে না।
- প্রথমেই হালকা করে ভিজিয়ে নিতে হবে একটি টিস্যু পেপার বা সুতি কাপড়।
- এবার সেই টিস্যু পেপারে বা সুতি কাপড়ে সুন্দর করে ভালো বীজগুলো রেখে দিন।
- টিস্যুসহ বীজগুলো জীপলক পলি বা এয়ারটাইট বক্সে রাখুন।
- এবার সেই বক্স বা জিপলক পলি ফ্রিজের নরমালে রেখে দিন। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ ৬০ থেকে ৯০ দিন সময় লাগে বীজ থেকে চারা বের হতে। তবে ১৫/২০ দিন পর পর আপনি চেক করে দেখবেন টিস্যু শুকিয়ে গেলে পানি ছিটা দিয়ে দিবেন।
৬০-৯০ দিন পর ফ্রিজ থেকে বীজগুলো বের করলে দেখতে পারবেন সেই বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়েছে। এবার এগুলো মাটিতে লাগাতে হবে।
- মাটি তৈরি করাঃ প্রথমে একটি ছোট্ট ওয়ান-টাইম গ্লাস বা চারা রোপণ করার পটে পর্যাপ্ত পরিমাণ দোআঁশ মাটি সাথে কোকোপিট বা জৈব সার দিয়ে নরম মাটি তৈরি করুন।
- বীজ রোপণঃ মাটিতে ১/২ ইঞ্চি গর্ত করে অঙ্কুরিত বীজটি আলতো করে সাবধানে রেখে হালকা করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- পানি ও আলোর যত্নঃ পটটিতে স্প্রে দিয়ে পানি দিতে থাকুন যেনো সবসময় মাটি ভেজা থাকে এবং পট এমন জায়গায় রাখবেন যেখানে সারাদিন পর্যাপ্ত রোদ থাকে এবং বাতাস চলাচল করে।
জমিতে এবং বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষের নিয়ম
কেউ বাড়িতে শখে আঙ্গুর চাষের বাইরে জমিতে এবং বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষ করতে চান তাহলে সঠিক নিয়মে মাটি তৈরি এবং মাদা প্রস্তুত করতে হবে।
সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে গাছের দূরত্ব বজায় না রেখে এবং গাছের জন্য সঠিক পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত না করলে আশানুরূপ ফলন পাবেন না। তাই নিচে বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি বা নিয়ম দেয়া হলো।
মাদা বা গর্ত তৈরি এবং সারের অনুপাত
- গর্তের সাইজঃ মাটিতে ২×২×২ অনুপাতে গর্ত খুঁড়তে হবে। অর্থাৎ ২ ফুট দৈর্ঘ্য, ২ ফুট প্রস্থ এবং ২ ফুট গভীর।
- প্রতি গর্তের জন্য সার প্রয়োগঃ গর্ত খননের পর যে মাটি বের হবে, সেই মাটির সঙ্গে ১০–১৫ কেজি পচা গোবর, ৪০০–৫০০ গ্রাম টিএসপি সার, ২৫০–৩০০ গ্রাম এমওপি (পটাশ) সার, ১০০–১৫০ গ্রাম জিপসাম এবং প্রায় ১০০ গ্রাম চুন ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর এই মিশ্রণ গর্তে ভরে কিছুদিন রেখে দিলে আঙ্গুরের চারা রোপণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে।
- মাটি শুকানোঃ সার মিশ্রিত মাটিগুলো আবার আগের মতো গর্তে দিয়ে গর্ত ভরিয়ে ১৫ দিন মতো রেখে দিতে হবে যেনো সার গুলো ভালোভাবে পচে মাটির সাথে মিশে যেতে পারে।
চারা রোপণের সঠিক সময় ও পদ্ধতি
- চারা রোপণের সময়ঃ বাংলাদেশে আঙ্গুরের চারা রোপণের সঠিক সময় হলো বর্ষার ঠিক আগে অর্থাৎ মে থেকে জুন অথবা বসন্ত কালে ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চ।
- রোপণ দূরত্বঃ বাণিজ্যিক আঙ্গুরের বাগানের আঙ্গুর গাছের লাইন ৮-১০ ফুট দূরত্বে দিতে হবে এবং লাইনে ৬-৮ ফিট দূরত্ব বজায় রেখে গাছ লাগাতে হবে।
- রোপণ পদ্ধতিঃ পলি ব্যাগ বা পট থেকে আলতো করে বের করে ভরাট করা গর্তে সাবধানে রোপণ করুন। চারা রোপণ করার পরে গোড়ায় একটু পানি দিন এবং বাতাসে যেনো না পড়ে যায় তাই শক্ত খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখুন এবং গাছের চার পাশের মাটি হালকা করে চেপে দিন।
মাচা তৈরি বা বাউনি দেওয়ার নিয়ম
- টেলিফোন পদ্ধতিঃ বাণিজ্যিক চাষের জন্যে মাচা তৈরি করা হয় টেলিফোন পদ্ধতিতে অর্থাৎ মাটির উপর ৫ থেকে ৬ ফিট উঁচু করে শক্ত কাঠ বা লোহা গেড়ে দিয়ে তার উপরে টি আকারে কাঠ বা লোহা আড়াআড়ি বেধে তার উপর দিয়ে চিকন তার টানা দিতে হবে।
- সাধারণ বাশের মাচাঃ ঘরোয়া বা ছোট পরিসরে বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ করতে চাইলে সাধারণ বাশের মাচাই যথেষ্ট। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখবেন মাচা যেনো ৫ ফিট বা তার থেকে বেশি হয় কারন মাচার নিচে দাড়িয়ে গাছের পরিচর্যা করা লাগবে।
ছাদ বাগানে বা টবে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি (শহুরে ছাদ চাষীদের জন্য)
ড্রাম বা টবের সঠিক সাইজ নির্বাচন
- সাইজঃ ছাদ বাগান আঙ্গুর চাষের জন্য সবথেকে ভালো হাফ ড্রাম এর সাইজ হলো ১০০ লিটার এবং টব হলে ন্যূনতম ১৮ থেকে ২০ ইঞ্চি হতে হবে।
- পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা: টব ও ড্রামের নিচের দিকে অবশ্যই ৪ থেকে ৫ টা ছিদ্র রাখতে হবে যাতে টব বা ড্রামের অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যেতে পারে।
টবের জন্য আদর্শ মাটি প্রস্তুতকরণ
টবে অনেক অল্প মাটি হয়ে থাকে তাই এই মাটি অনেক উর্বর হতে হবে।
- মাটি প্রস্তুতঃ টবে দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি ৫০% ব্যবহার করতে হবে সাথে জৈব সার বা কেঁচো সার ৩০% এবং কোকোপিট ও নদীর বালু ১০% করে দিতে হবে তাহলে টবের আঙ্গুর গাছ ভালোভাবে পুষ্টি পাবে।
- বিশেষ উপাদানঃ মাটির সাথে দুই চামচ হাড়ের গুড়ো, দই চামচ সিং কুচি এবং ৫০ গ্রাম সরিষার তেল মেশাতে হবে।
- মাটি প্রস্তুতের সময়ঃ মাটিতপ সবকিছু মিশিয়ে আঙ্গুর গাছের চারা রোপণ করার আগে ১০ থেকে ১২ দিন কড়া রোদে রেখে দিতে হবে।
ছাদ বাগানের জন্য মাচা ও গাছ ছাঁটাইয়ের প্রাথমিক নিয়ম
- ছাদের মাচাঃ ছাদ বাগানে আঙ্গুর চাষ করতে মাচা দিতে ড্রাম বা টবের চারি পাশে শক্ত বাশ বেঁধে জিআই তার দিয়ে জালের মতো বাঁধতে পারেন। এছাড়াও ছাদের রেলিংয়ে বাউনি দিয়েও রাখতে পারেন।
- গাছ ছাঁটাইঃ আঙ্গুর গাছ যতদিন না মাচায় উঠে যাচ্ছে ততদিন গাছের গোড়ার দিকে কোনো ডাল-পলা বা কুড়ি রাখবেন না। যখনি দেখবেন ডাল-পলা গজিয়েছে সাথে সাথে ছেটে দিবেন যাতে গাছের সকল শক্তি মাথার দিকে পেয়ে গাছ বাড়তে পারে।
আঙ্গুর গাছের বিশেষ পরিচর্যা ও সার প্রয়োগ
নিয়মিত পানি সেচ ও আগাছা দমন
- পানি সেচ দেয়ার নিয়মঃ আঙ্গুর গাছে নিয়মিত পানি সেচ দেয়া জরুরী তবে খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেনো অতিরিক্ত পানি জমে না থাকে এবং গোড়া একেবারে শুকিয়ে না যায়। সাধারণত সপ্তাহে ১ থেকে ২ বার পানি দিতে হবে। তবে যখন দেখবেন গাছে ফুল আসছে তখন গাছে পানি দেয়া কমিয়ে দিতে হবে এসময় পানি বেশি দিলে ফুল ঝরে যেতে পারে।
- আগাছা পরিষ্কার করার নিয়মঃ গাছের ২ থেকে ৩ ফুট এরিয়া সবসময় পরিষ্কার করে রাখতে হবে আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবেনা। কারন এখানে আগাছা জন্মালে মাটির অনেক পুষ্টি টেনে নিবে যার ফলে গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুন পাবেনা।
ফুল ও ফল আসার আগে-পরে প্রয়োজনীয় সার
- সাধারণ বৃদ্ধির সময়ঃ গাছের সাধারণ বৃদ্ধির সময় ১ থেকে ২ বছর সময় বার্ষিক পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার ১০ থেকে ১৫ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম, টিএসপি ২০০ গ্রাম ও এমওপি ১৫০ গ্রাম।
- ফলন্ত গাছের জন্য বিশেষ প্রয়োগঃ যখন গাছে ফল আশা শুরু করবে তখন বছরে দুইবার করে গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমে দিবেন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের দিকে যখন ডাল ছাটবেন তখন এর পরে দিবেন গাছে ফুল আসার আগে অর্থাৎ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে।
- ফুল আসার আগে সার প্রয়োগঃ আঙ্গুর গাছে ফুল আসার আগে ইউরিয়া সার কমিয়ে পটাস ও ফসফেট সার প্রয়োগ বাড়াতে হবে। পটাশ সার ফলের আকার বাড়াতে এবং আঙ্গুর ফল মিষ্টি করতে কাজ করে।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও তরল সার
আঙ্গুর মিষ্টি করার গোপন উপায় এবং টক হওয়ার কারণ
বাংলাদেশে আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি, টবে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করার নিয়ম এবং মাটিতে মিষ্টি আঙ্গুর চাষ করার নিয়ম উপরের আলোচনা থেকে আমরা যেনেছি। এই অংশে আমরা আঙ্গুর মিষ্টি করার গোপন উপায় এবং কেনো আঙ্গুর টক হয় তা জানাবো।
বাংলাদেশে আঙ্গুর কেন টক হয়?
- পর্যাপ্ত রোদের অভাবে।
- অসময়ে আঙ্গুর ফল গাছ থেকে নামালে।
- অতিরিক্ত পানি সেচ দিলে।
- গাছে অতিরিক্ত ফল থাকলে অনেক ফল টক হয়ে যায় কারন ফল অতিরিক্ত থাকলে সব যায়গায় পুষ্টিগুন সমান ভাবে পৌঁছাতে পারেনা।
- পটাশিয়াম ও বোরনের অভাবেও আঙ্গুর ফল টক হয়।
আঙ্গুর ১০০% মিষ্টি করার প্র্যাক্টিক্যাল টিপস
- পটাশ সার ও লাল সার আঙ্গুর গুটি বাঁধবে তখন মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
- গাছের অতিরিক্ত আঙ্গুরের থোকা ছাটাই করে ফেলে দিন।
- গাছে ফল আসার সময় থেকে গোড়ায় পানি দেয়া সীমিত করে দিন।
আঙ্গুর গাছের ডাল ছাঁটাই বা প্রুনিং (Pruning) করার সঠিক নিয়ম
ডাল ছাঁটাই কেন জরুরি?
- নতুন কুঁড়ি ও ফুল আনাঃ প্রুনিং করলে গাছের ঘুমন্ত কুড়ি জেগে উঠে এবং প্রচুর ফল ধরবে এমন নতুন ডাল বের করে।
- আলো বাতাস চলাচলঃ গাছের অতিরিক্ত ও রোগাক্রান্ত ডাল-পালা ছেটে দিলে গাছ অনেক পাতলা হয় এবং গাছে আলো বাতাস ভালোভাবে চলাচল করতে পারে।
- পুষ্টির সঠিক বন্টনঃ অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ডালপালা ছেঁটে দিলে পুরো গাছে সঠিকভাবে পুষ্টি পায় যার ফলে গাছে ফল ফুল খুব ভালো আসে।
ডাল ছাঁটাই করার সঠিক মাস
- প্রাধান ছাঁটাইঃ বাংলাদেশে সাধারণ প্রধান ডাল ছাঁটাই করার সময় হলো শীতকাল বিশেষ করে ফেব্রুয়ারী মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখে ডাল-পলা ছাটাই করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
- দ্বিতীয় ছাঁটাইঃ এই দ্বিতীয় ছাঁটাই দেয়া অতটা জরুরি না হলেও হালকা ছাঁটাই করা বা প্রুনিং করা ভালো। এই ছাঁটাই গ্রীষ্মকালে করতে হয়। জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে অতিরিক্ত যেই ডাল-পালা থাকবে সেগুলো ছেঁটে দিবেন।
আঙ্গুর গাছের ডাল ছাঁটাই করার সঠিক পদ্ধতি
- প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিঃ আঙ্গুর গাছের ডাল কাটার জন্য বাজার থেকে একটি প্রুনিং কাচি কিনে নিবেন। যতবারই ব্যবহার করবেন ততবারই এই কাচিতে ডেটল বা স্যাভলন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিবেন।
- অপ্রয়োজনীয় ডাল অপসারণঃ ডাল ছাঁটাই করার প্রথমেই শুকানো, চিকন সুতার মতো, অপ্রয়োজনীয় ও রোগাক্রান্ত ডাল-পালা গুলো ছেটে নিতে হবে।
- চোখ বা বাড গণনা করে কাটাঃ আপনি যখন আঙ্গুর গাছের প্রুনিং করবেন তখন অবশ্যই মূল ডাল থেকে ৫ বা ৬ টি চোখ রেখে বাকিগুলো কাটবেন। এই ৫ বা ৬ টি চোখ বা বাড থেকে যে ডালগুলোত বের হবে সেগুলোতে প্রচুর ফল ধরবে।
- ছাঁটাইয়ের পরের যত্নঃ গাছের ডাল ছাঁটাই করার পরে সেখানে ফাঙ্গাস আক্রমণ করতে পারে তাই চুন ও তুঁতের মিশ্রন অথবা বাজার থেকে ছত্রাক নাশক কিনে এনে দিতে হবে।
আঙ্গুর গাছের রোগবালাই, পোকামাকড় ও তার প্রতিকার
প্রধান ছত্রাকজনিত রোগ ও প্রতিকার
ডাউনি মিলডিউ
- লক্ষণঃ এই রোগে আক্রান্ত গাছের পাতায় হলুদ ছোপ ছোপ দাগ হয় এবং উল্টোদিকে সাদা ছত্রাক দেখা দেয়। এই রোগ হলে পাতা ঝরে পড়ে যায় এবং আঙ্গুরের গুটিগুলো ঝরে যায়।
- প্রতিকারঃ প্রথমেই আক্রান্ত ডালগুলো ছেঁটে দিয়ে পাতাগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলুন এবং প্রতি লিটার পানিতে ম্যানকোজেব বা মেটালাক্সিল গ্রুপের ছত্রাক নাশক যেমন, রিডোমিল গোল্ড ১০ থেকে ১২ দিন পর পর দিতে হবে।
পাউডারি মিলডিউ
- লক্ষণঃ এই রোগে আক্রান্ত গাছের পাতা, কচি ডাল এবং ফলের উপর সাদা গুড়া বা ছাইয়ের মতো আস্তরণ পড়ে যার ফলে ফল শক্ত হয়ে ফেটে যায়।
- প্রতিকারঃ এই রোগ আঙ্গুর গছে হলে হেক্সাকোনাজল বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাক নাশক যেমন টিল্ট প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে সাথে আঙ্গুর গাছের গোড়া এবং ডাল-পাতাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রোদ নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষতিকর পোকামাকড় ও তার প্রতিকার
ফল ছিদ্রকারি পোকা
- লক্ষণঃ এই পোকা আঙ্গুর ফল যখন বেড়ে উঠে এমন অবস্থায় ফুটো করে ভেতরের শ্বাঁস খেয়ে ফেলে।
- প্রতিকারঃ এই পোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্রথমে আক্রান্ত ফল পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জৈব পদার্থের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিম পাতার রস করে গাছে স্প্রে করে দিতে হবে। যদি আক্রান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে হয়ে যায় তাহলে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সাইপারমেথ্রিন বা এমামেকটিন বেনজোয়েট মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: আঙ্গুর বীজ থেকে চারা তৈরি করলে কি ফল মিষ্টি হয়?
উত্তরঃ হ্যাঁ, বীজ থেকে চারা তৈরি করলে ফল মিষ্টি হয় তবে কলমের চারা থেকে মিষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
প্রশ্ন ২: আঙ্গুর গাছ লাগানোর কতদিন পর ফল আসে?
প্রশ্ন ৩: একটি আঙ্গুর গাছ কত বছর পর্যন্ত ফল দেয়?
উত্তরঃ একটি আঙ্গুর গাছ সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে ১০০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে তবে সাধারণত ৩০ বছর থেকে ৫০ বছর অনায়াসে ফল দেয়।