হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব? জানুন শ্রবণযন্ত্রের ট্রাবলশুটিং গাইড

যারা কানে কম শুনতে পান তাদের জন্য হিয়ারিং এইড হলো অন্যদের কথা শোনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। আজকের পোস্টে আমরা হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব তা জানবো। এই হিয়ারিং এইড শুধু একটা ইলেকট্রিক ডিভাইস নয় বরং যারা কানে কম শুনে তাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

এই ইলেকট্রিক ডিভাইসটি অন্য সকল ডিভাইসের মতোই মাঝে মাঝে বিকল হয়ে যেতে পারে তাই আমরা আজকের পোস্টে হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব বা এই শ্রবণযন্ত্রের ট্রাবলশুটিং গাইড দিবো।

আমরা যারা হিয়ারিং এইড ব্যবহার করি অনেক সময় আমাদের কাছে যন্ত্রটি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। যা দেখে অনেকেই ভাবেন একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে এবং সেটি ফেলে দিয়ে নতুন হিয়ারিং এইড কিনে নিয়ে আসি। তবে যন্ত্রটি নষ্ট হলে যে সবক্ষেত্রেই ঠিক করা যাবেনা তা কিন্তু নয়।

অনেক সময় ছোট সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে যায় যেটি অল্পকিছু সমাধান করার পরেই ঠিক হয়ে যায়। তাই নষ্ট হলে আগে ভাগে নতুন একটি না কিনে আমাদের পোস্টের নিচের অংশে দেয়া গাইডলাইন ফলো করে ঠিক করে নিন।

Disclaimer: আমাদের এই পোস্টে শুধুমাত্র হিয়ারিং এইড ডিভাইস নষ্ট হয়ে কিভাবে ঠিক করবেন অর্থাৎ শ্রবণযন্ত্রের ট্রাবলশুটিং গাইড দেয়া হয়েছে। এটি কোনোভাবেই কানের কোনো চিকিৎসা বা এর বিকল্প কিছু এবং ডাক্তারের কোন পরামর্শ না।

হিয়ারিং এইড একটি ইলেক্ট্রিক যন্ত্র যেটি নষ্ট হলে আপনি কিভাবে ঠিক করবেন সেই তথ্যটুকু শুধুমাত্র আমরা এই পোস্টে দিয়েছি।

হিয়ারিং এইড চালু আছে কিনা কিভাবে বুঝবো?

হিয়ারিং এইড ব্যবহারকারীরা মাঝেমধ্যে বুঝতে পারেনা তাদের যন্ত্রটি চালু আছে নাকি বন্ধ হয়ে আছে। তবে কিছু বিষয় খেয়াল করলে সহজে বোঝা যায় যেগুলো আমরা নিচে দিয়েছি। যেহেতু আমার নিজের দাদি হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি ব্যবহার করে তাই আমি নিজে এই নিয়মগুলোতে চেক করি।

  • হ্যান্ড-টেস্ট বা কাপিং পদ্ধতিঃ আপনার হিয়ারিং এইড চালু আছে কিনা বুঝতে প্রথমে কাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। আপনার হাতের মুঠোতে ডিভাইসটি নিয়ে কাপের মতো ধরে রাখুন মেঝেতে বা টেবিলে। ডিভাইস যদি চালু থাকে তাহলে বেশ কিছু কোম্পানির ডিভাইসের ভেতর থেকে হালকা শিস দেয়ার মতো শব্দ বের হবে।
  • এলইডি ইন্ডিকেটর লাইট চেকঃ ভালোমানের হিয়ারিং এইড ডিভাইসে ছোট একটি এলইডি লাইট থাকে। আপনি অন করার পরে খেয়াল করে দেখুন যে সেই লাইট জ্বলছে কিনা যদি জ্বলে তাহলে ঠিক আছে।
  • অডিও টেস্ট ও ভলিউম পরিবর্তনঃ আপনার হিয়ারিং যন্ত্রটি চালু আছে কিনা বুঝতে যন্ত্রটি কানে ধরুন। যদি স্বাভাবিক ভাবে আশেপাশের সাউন্ড স্পষ্ট শুনতে পান তার মানে যন্ত্রটি ঠিকঠাক চালু আছে।

হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব? নষ্ট হওয়ার কারণ ও সমাধান

আপনার হিয়ারিং এইড যদি উপরের পরীক্ষা গুলো করার পরেও চালু না হয় ও কোনো শব্দ শোনা না যায় তাহলে এমন না যে অনেক বড় সমস্যা হয়েছে ঠিক হবেনা।

বেশিরভাগ সময় দেখা যায় হিয়ারিং এইড সাধারণ সমস্যার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। শ্রবণযন্ত্রের এই সমস্যা গুলো আপনি বাসাতে বসেই ঠিক করতে পারবেন। নিচে হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব তা দেয়া হলো।

ব্যাটারির সমস্যা বা ডেড ব্যাটারি

হিয়ারিং এইডের অন্যতম বড় একটি সমস্যা হলো একটি নির্দিষ্ট সময় চলার পরে এর ব্যাটারি শেষ বা ডেড হয়ে যায়। আবার অনেক সময় দেখা যায় ব্যাটারি ডেড হওয়ার পরে নতুন ব্যাটারি লাগিয়েছেন কিন্তু ব্যাটারির স্টিকার তুলেন নি বা উল্টা করে লাগিয়েছেন ফলে হিয়ারিং অন হয়না।

  • সমাধানঃ আপনার ব্যাটারি ডেড হলে সেটি যদি রিচার্জেবল হয় তাহলে চার্জ দিন অথবা বাজার থেকে নতুন ব্যাটারি কিনে নিয়ে এসে নেগেটিভ ও পজিটিভ সঠিকভাবে হিয়ারিংয়ে লাগিয়ে দিন।

ইয়ারওয়াক্স বা কানের ময়লা জমে ব্লক হওয়া

অনেকের একটি সমস্যা দেখা যায় সেটি হলো আমাদের কানে ওয়াক্স বা ময়লা দিয়ে হিয়ারিং এইডের সাউন্ড বের হওয়ার ছিদ্রপথ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় অনেক সময় থেকে হিয়ারিং এইড পরিষ্কার না করলে।

  • সমাধানঃ অনেক হিয়ারিং এইড এর সাথে পরিষ্কার করার জন্য ছোট ব্রাশ বা পরিষ্কার করার টুল দেয় সেটি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।

আর্দ্রতা বা ঘামের প্রভাব

হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি যেহেতু অনেক সময় ধরে কানে রাখতে হয়। তাই অনেক সময় এর ভেতরে ঘাম বা আর্দ্রতা ঢুকে কার্যকারিতা সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয়।

  • সমাধানঃ এমন অবস্থায় পড়লে আপনার প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে যন্ত্রটি কোনোভাবেই হেয়ার ড্রায়ার বা তাপ দিয়ে শুকানোর চেষ্টা না করা। বরং সাধারণ ভাবে ব্যাটারি খুলে বাসার নরম শুকনো কাপড়ের উপর রেখে দিন এতে করে আর্দ্রতা শুকিয়ে আবার ঠিকঠাক কাজ করবে।

হিয়ারিং এইডের তার পরিবর্তন করা যাবে কি?

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব। তবে অনেকের মাঝে একটি কমন প্রশ্ন দেখা যায় সেটি হলো হিয়ারিং এইডের তার পরিবর্তন করা যাবে কি?

সহজভাবে যদি বলি হ্যাঁ হিয়ারিং এইডের তার বা টিউব পরিবর্তন করা যাবে। এটি মূলত যেই হিয়ারিং এইড যন্ত্রগুলো কানের পেছনে থাকে এবং একটি তার বা টিউবের মাধ্যমে কানে শব্দ পৌঁছায় সেগুলির জন্য কাজে লাগে।

কিভাবে হিয়ারিং এইডের তার বা টিউব পরিবর্তন করবেন তা নিচে দেয়া হলোঃ

  • কখন পরিবর্তন করবেনঃ হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে শরীরের ঘাম বা তাপমাত্রার কারণে প্লাস্টিকের তার শক্ত হয়ে হলদে রং ধারণ করতে পারে। এছাড়াও কোনোভাবে আঘাত পেয়ে তার ভেঙে গেলে, আওয়াজ কম শোনা গেলেও এটি পরিবর্তন করতে হবে। হিয়ারিং এইডের পারফরম্যান্স যদি ভালো পেতে চান তাহলে ৩ থেকে ৬ মাস পর পর পরিবর্তন করা ভালো।
  • কিভাবে পরিবর্তন করবেনঃ যারা অভিজ্ঞ হিয়ারিং ব্যবহারকারী তারা সাধারণত তার নষ্ট হয়ে গেলে বাজার থেকে নতুন তার কিনে লাগিয়ে দেই। তবে আপনি যদি নতুন ব্যবহারকারী হয়ে থাকেন তাহলে সার্ভিস সেন্টার থেকে পরিবর্তন করে নিন। নতুন অবস্থায় নিজে পরিবর্তন করতে গিয়ে তার টেনে খোলার সময় ভেতরের কানেকশন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নষ্ট হিয়ারিং এইড কি মেরামত করা যায়?

আমরা অনেকেই মনে করি হিয়ারিং এইড যন্ত্র যদি একবার নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটি আর ঠিক করে ব্যবহার করা যায় না। যার কারণে অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন নষ্ট হিয়ারিং এইড কি মেরামত করা যায়?

আমরা যদি আপনাদের এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দি তাহলে বলতে হবে হ্যাঁ অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হিয়ারিং এইড মেরামত করা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে আপনার হিয়ারিং এইডের কি নষ্ট হয়েছে বা নষ্ট হওয়ার মাত্রা কতোটুকু তার উপর নির্ভর করে ঠিক হবে নাকি নতুন কিনতে হবে না নির্ভর করে।

  • আপনার হিয়ারিং যদি সাধারণ মেরামতের দরকার হয় যেমন, ব্যাটারি পরিবর্তন, ফিল্টার পরিবর্তন, প্লাস্টিকের তার বা টিউব পরিবর্তন করা তাহলে আপনি বাসায় মেরামত করে ফেলতে পারবেন।
  • তবে যদি হাত থেকে পড়ে পার্টস ভেঙে যায়, Electronic Components এ পানি ঢুকে যাওয়াসহ এমন বড় বড় সমস্যা দেখা দেয় তাহলে সার্ভিসিং সেন্টার থেকে ঠিক করে নিতে হবে।

পরামর্শঃ আপনার হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি নষ্ট হলে তাড়াহুড়ো করে নিজে নিজে খুলে ঠিক করার আগে দেখুন হিয়ারিং এইডের ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি এখনো আছে কিনা। ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি থাকলে বিনামূল্যে বা একেবারেই স্বল্প টাকায় যন্ত্রটি ঠিক করতে পারবেন।

কখন বুঝবেন নতুন হিয়ারিং এইড কেনার সময় হয়েছে?

এই শ্রবণযন্ত্রটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেরামত করে ঠিক করার পরে আবার ব্যবহার করা যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নতুন হিয়ারিং এইড যন্ত্র কিনতে হতে পারে।

নিচে কখন বুঝবেন নতুন হিয়ারিং এইড কেনার সময় হয়েছে তা দেয়া হলো।

  • হিয়ারিং এইড যন্ত্রটির বয়স ৩ থেকে ৭ বছর হলেঃ অধিকাংশ হিয়ারিং এইড যন্ত্র ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত খুব ভালো ভাবে ব্যবহার করা যায় এবং এর পরে ভেতরের অনেক যন্ত্রাংশ ক্ষয় হয়ে যেতে পারে ফলে কাঙ্ক্ষিত সার্ভিস পাওয়া যায় না। তাই ৩ থেকে ৭ বছর হয়ে গেলে আপনি নতুন শ্রবণযন্ত্র কিনতে পারেন।
  • বার বার নষ্ট হলেঃ আপনি যদি দেখেন আপনার হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি বার বার নষ্ট হচ্ছে এবং একাধিকবার ঠিক করেছেন তার পরেও পুনরায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাহলে নতুন হিয়ারিং কেনার সময় হয়ে গেছে।
  • শ্রবণশক্তির পরিবর্তন হলেঃ যাদের শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করতে হয় তাদের বয়সের সাথে বা শারীরিক কারণে শ্রবণশক্তির পরিবর্তন হলে আগের হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি বর্তমান শ্রবণশক্তির উপযোগী হতে হবে। যদি আগের যন্ত্রটি বর্তমান শ্রবণশক্তির সাথে না মিলে তাহলে নতুন হিয়ারিং এইড যন্ত্র কিনতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১ঃ রাতে ঘুমানোর সময় কি হিয়ারিং এইড পরে থাকা উচিত?

উত্তরঃ রাতে ঘুমানোর সময় হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি পরে থাকা উচিত না। কারণ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আপনার কানের বিশ্রাম দরকার আছে এবং ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় পরে থাকলে চাপ লেগে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রশ্ন ২ঃ হিয়ারিং এইডে কোনো শব্দ না শুনলে ১ম কাজ কী?

উত্তরঃ আপনার হিয়ারিং এইড যন্ত্রটিতে কোনো শব্দ না শুনলে ১ম কাজ হলো ব্যাটারি পরিবর্তন বা চার্জ করা যদি ঠিক না হয় তাহলে ফিল্টার পরিষ্কার করা।

প্রশ্ন ৩ঃ হিয়ারিং এইড প্রতিদিন কীভাবে পরিষ্কার করা উচিত?

উত্তরঃ হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি প্রতিদিন ব্যবহার করার পরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছতে হবে এবং কানের কোনো ময়লা লেগে থাকলে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

শেষকথা

হিয়ারিং এইড এমন একটি আধুনিক জিনিস যার মাধ্যমে যাদের শ্রবণশক্তি কমে যায় তারাও সঠিকভাবে শব্দ শুনতে পায়। আশা করি আজকের পোস্ট পড়ে হিয়ারিং এইড নষ্ট হলে কি করব তা জেনেছি।

যাদের শ্রবণশক্তি কমে গেছে তাদের জন্য হিয়ারিং এইড যন্ত্রটি অনেক কার্যকরী একটি ডিভাইস যার মাধ্যমে যাদের শ্রবণশক্তি কম তারা নরমাল মানুষের মতোই কথা শুনতে পাবে।

বিশেষ বার্তাঃ আমাদের উপরে দেয়া সকল তথ্য শুধুমাত্র হিয়ারিং এইড (Hearing Aid) যন্ত্রটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেয়া হয়েছে। আপনার হিয়ারিং এইড যন্ত্রটির হার্ডওয়্যারের সমস্যা হলে বা শ্রবণশক্তির পরিবর্তন হলে অবশ্যই আপনাকে ENT Specialist বা Audiologist এর পরামর্শ নিতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

প্রযুক্তি সম্পর্কিত আরো পড়ুনঃ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top